শনিবার, ০৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৮:৩৯ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম :
বেগম খালেদা জিয়ার স্মরণে টিডিএসে খোলা হয়েছে শোক বই বেগম জিয়ার আত্মার মাগফেরাত কামনায় ট্রাফিক স্কুলে দোয়া মাহফিল স্কুল অব লিডারশিপ এর আয়োজনে দিনব্যাপী পলিটিক্যাল লিডারশিপ ট্রেনিং এন্ড ওয়ার্কশপ চাঁদপুরে সাহিত্য সন্ধ্যা ও বিশ্ববাঙালি মৈত্রী সম্মাননা-২০২৫ অনুষ্ঠিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনায় টিডিএসে দোয়া মাহফিল সব্যসাচী লেখক, বিজ্ঞান কবি হাসনাইন সাজ্জাদী: সিলেট থেকে বিশ্ব সাহিত্যে কসবায় বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মুশফিকুর রহমানের পক্ষে নেতাকর্মীদের গণসংযোগ ও লিফলেট বিতরন ৭ই নভেম্বর: সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান এখন কবি আল মাহমুদের সময় দৈনিক ঐশী বাংলা’র জাতীয় সাহিত্য সম্মেলন ১৭ জানুয়ারি-‘২৬ ঢাকার বিশ্ব সাহিত্যকেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হবে
সংকটে বিপদে এখনও তিনিই আলোকবর্তিকা

সংকটে বিপদে এখনও তিনিই আলোকবর্তিকা

– দীপক সাহা (পশ্চিমবঙ্গ)

‘আজি হতে শতবর্ষ পরে,কে তুমি পড়িছ বসি আমার কবিতাখানি।’ আজ পঁচিশে বৈশাখ। আজকের দিনটি উৎসর্গিত কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতি। ২০২১- এ দাঁড়িয়েও কতটা প্রাসঙ্গিক কবি তা বোঝা যায় ওনারই লেখা এই লাইনের মাধ্যমে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রাসঙ্গিকতা ব্যাপক ও বহুমাত্রিক। জীবনের প্রতিটি বাঁকে তাঁর অবাধ বিচরণ। বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে তাঁর চিন্তাধারা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রবীন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন এমন এক ভারতবর্ষ যেখানে চিত্ত ভয়শূন্য, জ্ঞান মুক্ত এবং শির উচ্চ। রবীন্দ্রনাথ তাঁর গান, কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক ও প্রবন্ধে সমস্ত ক্ষুদ্র ধর্মভেদ, জাতিভেদের উর্ধ্বে উঠে আন্তর্জাতিক ভ্রাতৃত্ববোধের কথা বলে গেছেন। “নাগিনীরা চারিদিকে ফেলিতেছে বিষাক্ত নিঃশ্বাস। শান্তির ললিতবাণী শোনাইবে ব্যর্থ পরিহাস।” আজকের অশান্ত, অস্থির ভারতে ভেদাভেদের রাজনীতির পরিমণ্ডলে কবিগুরুর গানই সৃষ্টি করতে পারে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বাতাবরণ। তাঁর লেখা জাতীয় সঙ্গীত দেশের অখণ্ডতা বজায় রাখার বীজমন্ত্র। তাঁর চিন্তাধারা দেশ, কাল, সময়ের ক্ষুদ্র গণ্ডীর বলয় অতিক্রম করে অগ্রসর হয়েছে বিশ্বায়নের পথে। এ-জন্যই রবীন্দ্রনাথ বিশ্বকবি। তাঁর আবেদন সর্বজনীন।

‘মোর নামএই বলে খ্যাত হোক, আমি তোমাদেরই লোক।’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমাদের বাঙালি অস্তিত্বর সঙ্গে সম্পৃক্ত। তিনি আমাদের ঘরের মানুষ। ‘সহজ পাঠ’, ‘কিশলয়’ থেকে শুরু করে ‘শেষের কবিতা’ – এ-রকম অসংখ্য মণিমুক্তোর মধ্যেই গ্রথিত আছে বাঙালির মানস অস্তিত্ব নির্মাণের কারুকার্য। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে বিস্তৃত মহাসমুদ্ররূপ রচনা সমগ্র রেখে গেছেন তাঁর প্রতিটি ক্ষেত্রই হল বাঙালির মনন ও চৈতন্যের বিকাশের জন্য শিক্ষাচিন্তার স্মারক এবং বাহক। তিনি প্রাচীন ভারতের আশ্রমিক শিক্ষার প্রতি অনুরক্ত ছিলেন। সেই ভাবধারায় তিনি আগামী প্রজন্মের মানবিক গুণসম্পন্ন সৃজনশীল মানুষ তৈরি করতে ব্রহ্মবিদ্যালয় ও শান্তিনিকেতন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। রাজনীতি থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে তিনি সর্বদা আগলে রেখেছিলেন। এমনকি, গান্ধীজির অসহযোগ আন্দোলনের তীব্র উত্তেজনার আঁচ তিনি তাঁর সাধের শান্তিনিকেতনের উপর লাগতে দেন নি। বর্তমানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো অসুস্থ রাজনীতির আঁতুড়ঘর। ফলে শিক্ষার সামগ্রিক পরিবেশ বিঘ্নিত, কলুষিত। শিক্ষার পরিবেশ সর্বাঙ্গীণ সুন্দর ও গতিময় করতে রবীন্দ্র পথনির্দেশনা মেনে চললে আখেরে আমাদেরই উপকার হবে। বিশ্বায়নের প্রভাবে এখন বাঙালি ইংরেজিমুখী। সরকারও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই মুখীকরণে মদত দিচ্ছে। ফলে প্রত্যন্ত গ্রামেও ব্যাঙের ছাতার মতো ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের রমরমা। বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলি ধুঁকছে। এ-যেন দুয়োরানী সুয়োরানীর গল্প। শিক্ষার মাধ্যম হবে বাংলা ভাষা। এ-ব্যাপারে তাঁর মতামত ছিল চূড়ান্ত। তিনি বলেছিলেন – ” ইংরেজি ভালো করিয়া শিখিতে হইবে। তবে বিদ্যালয়, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে মাতৃভাষার মাধ্যমে সকল জ্ঞান বিজ্ঞান শিখাইতে হইবে। পরভাষার মধ্য দিয়া পরিস্রুত শিক্ষায় বিদ্যার প্রাণীন পদার্থ নষ্ট হইয়া যায়।” শিক্ষা যেন শুধুমাত্র পুস্তকনির্ভর এবং আয়োজন সর্বস্ব শিক্ষা না হয় তা তিনি ‘তোতাকাহিনী’তে লিখেছিলেন। কিন্তু বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা নিরানন্দময়। আমরা রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আনুষ্ঠানিক মাতামাতি করি কিন্তু তাঁর আদর্শ ও ভাবধারার প্রতি সুবিচার করি না।

তাঁর স্বদেশ ভাবনার মৌলিকতা কেবল দেশের স্বাধীনতার মধ্যে নিহিত ছিল না। বাক স্বাধীনতা, চিন্তার স্বাধীনতা ও জাতীয় স্বাধীনতা সম্পর্কিত তাঁর ভাবনা এবং পথ নির্দেশও তিনি তাঁর অমর লেখনীর মাধ্যমে ব্যক্ত করে গেছেন। ক্ষমতাসীন সরকার নানা অছিলায় স্বাধীনতার কণ্ঠরোধ করছেন। সরকারের এই ভয়ঙ্কর রূপ কবিগুরুর আদর্শের পরিপন্থী। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন, রাখীবন্ধন, জালিয়নাবাগের হত্যকাণ্ড প্রভৃতি ঘটনার মধ্যে দিয়ে আমরা তাঁর দেশপ্রেমের প্রকৃত পরিচয় পাই। উগ্র জাতীয়তাবাদকে কবি কখনই প্রশ্রয় দেন নি। আজকে আমাদের উপমহাদেশে মেকী উগ্র জাতীয়তাবাদের প্রতিষেধক হিসাবে রবীন্দ্রনাথের চিন্তাধারা ভীষণ কার্যকরী।

উপনিষদের আদর্শে অনুপ্রাণিত কবি বিশ্বলোক ও অন্তরলোকের মধ্যে সেতুবন্ধ রচনা করেছেন। এই অন্তর্মিলনই কবির দর্শন ও মননের মূলভিত্তি। তাঁর কবিতা, গান, নাটক ও অন্যান্য রচনায় প্রকাশ পায় ঈশ্বরচিন্তা, নান্দনিকতা, প্রকৃতি প্রেম ও মানব প্রেম। আর সেখানেই রবীন্দ্রনাথ কালজয়ী। তিনি বিশ্বপ্রেম ও বিশ্বমৈত্রীর উদগাতা ছিলেন। তাঁর রচনা সমসাময়িক সমাজ, প্রচলিত ধর্ম, সাংস্কৃতিক স্থিতি, রাজনৈতিক মতাদর্শ সবকিছুকে অনায়াসে অতিক্রম করে যায়। থাকে কেবল মানবতা, তা সমাজের, দেশের এবং বিশ্বের। মনুষ্যত্ববোধের উৎকর্ষ সাধনই তাঁর রচনার মূলমন্ত্র, মূলধর্ম। এজন্যই তিনি সর্বদেশে, সর্বকালে, সর্বসমাজে প্রাসঙ্গিক। তিনি প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মকে অনুসরণ করতেন না। কবির মতে মানব সমাজে কল্যাণ আর প্রকৃতিতে শান্তি প্রতিষ্ঠাতেই ঈশ্বরের প্রকৃত প্রকাশ। আজকের পৃথিবীতে যে শোষণ, নিপীড়ন, হিংসা, বিদ্বেষ, অসহনশীলতা, ক্ষমতার দম্ভ, প্রাচুর্যের অশ্লীল প্রদর্শন আর সমগ্র পৃথিবীব্যাপী যে বহুধা বিভক্ত শক্তির প্রদর্শনী, এ-সব কিছুর ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের এই মানব ধর্মের চাইতে বেশি প্রাসঙ্গিক আর কি হতে পারে ?

তিনি যা কিছুই লিখেছেন তার সমস্ত কিছুই মানবতার কল্যাণে। যুগ যুগ ধরে নারীকে শুধুমাত্র ভোগ্যবস্তুরূপে চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু এক রবীন্দ্রনাথ যখন হৈমন্তী গল্পে নারীকে নিয়ে লিখেছেন – ‘ সে আমার সম্পত্তি নয় সে আমার সম্পদ ‘, তখনই বদলে গেল সমস্ত গতানুগতিক ধারণা। যা কিছু সুন্দর, মঙ্গল ও কল্যাণকর তিনি আমাদের জন্য তা-ই রেখে গেছেন। এ-কারণে সবসময়ের জন্য তিনি আধুনিক।

শুধুমাত্র সাহিত্যচর্চা নয়, মানুষের কল্যাণে রবীন্দ্রনাথ সারা জীবন কাজ করে গেছেন। শ্রীনিকেতন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কৃষি ও ক্ষুদ্র শিল্প বিস্তারে ভূমিকা রেখেছেন। এদেশে মাইক্রোক্রেডিটের জনক রবীন্দ্রনাথ। নোবেল পুরস্কারের সমস্ত অর্থ তিনি এই খাতে বিনিয়োগ করেছিলেন। তিনিই প্রথম কৃষি সমবায় ব্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।রবীন্দ্রনাথ নিজেও ভাবতেন জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা যতই আধুনিক হবে, যতই উদ্ভাবনী শক্তির সম্ভাবনা মানুষের দ্বারে পৌঁছবে ততই দেশ ও জাতি অগ্রগামী বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারবে। রবীন্দ্রনাথের এই আধুনিক এবং বিজ্ঞানমনস্ক ধারণা বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগেও কত প্রাসঙ্গিক তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

জাতির মহাসঙ্কটে, উৎসবে কিংবা অপার আনন্দেও রবীন্দ্রনাথ আমাদের প্রতিদিনের অনুপ্রেরণা, নিত্যকর্মযোগ এবং চিরকালীন ঐতিহ্য। বিশ্বকবির চিরস্থায়ী সৃষ্টি সম্ভার আধুনিক প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেয়ার দায়ভার যেমন আছে পাশাপাশি এখনও কতখানি তিনি প্রাসঙ্গিক এবং অপরিহার্য সেটাও স্পষ্ট হওয়া অত্যন্ত জরুরী। বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পরিচিত করার জন্য রবীন্দ্রনাথের রচনাসমূহ বেশি করে চর্চা ও গবেষণা করা বিশেষভাবে প্রয়োজন। আধুনিক উদ্ভাবনী নিত্যনতুন তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমেই তাঁকে সবার একান্ত নিকটে নিয়ে আসতে হবে। তাঁকে আত্মস্থ করতে পারলে আধুনিক প্রজন্ম সমৃদ্ধ হবে, তাদের চলার পথ হবে সুগম ।

রবীন্দ্রনাথের প্রাসঙ্গিকতা আজ বিশ্বজনীন। তাঁর সৃজনশীলতা আধুনিক, সর্বজনীন ও চিরস্থায়ী। বাঙালির সভ্যতা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, পরম্পরার সঙ্গে ররবীন্দ্রনাথ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। রবীন্দ্রনাথ আমাদের অহঙ্কার, আমাদের অস্তিত্ব, আমাদের প্রেরণা, আমাদের সমৃদ্ধি। তিনি এখনো দুই বাংলার মানুষের অন্তহীন প্রেরণার উৎস। বাঙালি তার সকল সংকট, সংগ্রাম অতিক্রম করেছে তাঁর গান গলায় ধারণ করে। রবীন্দ্রনাথের গান আমাদের জীবনের উপলব্ধি, সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনার সাথী। আমাদের শয়নে, স্বপনে, জাগরণে, চিন্তনে, মননে রবীন্দ্রনাথ সদা জাগ্রত। তিনি আধুনিক ভারতের নব তীর্থভূমি। ভারত-আত্মার বিগ্রহ। বর্ণাঢ্য প্রতিভার অধিকারী রবীন্দ্রনাথ আমাদের কাছে এক চিরন্তন আলোকবর্তিকা।

এই সংবাদটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




raytahost-demo
© All rights reserved © 2019
ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতায়: Jp Host BD